জামিনে কারামুক্ত বাউলশিল্পী আবুল সরকার
মেলবোর্ন, ১৩ এপ্রিল- জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন বাউলশিল্পী আবুল সরকার। আজ সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট ২ থেকে তিনি মুক্তি পান।…
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- বিশ্বজুড়ে যখন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ইহুদিবিরোধী বিদ্বেষ—কখনও তা বক্তৃতা ও প্রচারণায়, কখনও সহিংসতায়, আবার কখনও সংগঠিত উসকানিতে—তখন গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া একেবারেই একরকম নয়। কোথাও এই ধরনের চরমপন্থী বক্তাদের প্রবেশ ও কার্যক্রমে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও ক্রমেই কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্মেলন, সামাজিক সমাবেশ এবং প্রবাসী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কিছু ইসলামপন্থী বক্তা সক্রিয় রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে ইহুদি, ইসরায়েল কিংবা অমুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়েছেন। এসব বক্তব্যের একটি বড় অংশই সরাসরি অ্যান্টি-সেমিটিক ঘৃণার পর্যায়ে পড়ে, যা ইতিহাসে বহুবার সহিংসতা ও বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি আরও কঠোর নজরদারির ইঙ্গিত দিয়েছে। ৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি ইসলামিক বক্তা শায়খ আহমদুল্লাহর ভিসা বাতিল করে, ফলে তার নির্ধারিত বক্তব্য অনুষ্ঠানগুলো স্থগিত হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ইহুদিদের নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক ও উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। বর্তমানে ডিপার্টমেন্ট অফ হোম অ্যাফেয়ার্স তার বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে তার এক ভিডিও বক্তব্য থেকে, যেখানে তিনি ছোটখাটো সংঘাতকেও একটি তথাকথিত “ইহুদি ষড়যন্ত্র”-এর অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার পেছনে ইহুদিদের গোপন ভূমিকার অভিযোগ তোলেন। এক অনলাইন বক্তব্যে তিনি বলেন, “একজন আলেম বলেছেন—দুটি মাছ যদি লড়াই করে, তবুও বুঝতে হবে এর পেছনে ইহুদি ষড়যন্ত্র রয়েছে।”
এই ধরনের বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত অ্যান্টি-সেমিটিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বেরই প্রতিধ্বনি, যা ইতিহাসে সহিংসতা উসকে দিয়েছে।
এই ঘটনা একক নয়। এর আগে আরেক বাংলাদেশি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে তার অতীত বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর অস্ট্রেলিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ইহুদিদের “বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং এডলফ হিটলার কে “ঈশ্বরের শাস্তি” বলে উল্লেখ করেছিলেন—যা শুধু রাজনৈতিক সমালোচনার সীমা ছাড়িয়ে স্পষ্ট উসকানিমূলক ও ইতিহাস বিকৃতির পর্যায়ে পড়ে।
মিজানুর রহমান আজহারী এবং শায়খ আব্দুল্লাহর অস্ট্রেলিয়া সফরটি আয়োজন করেছিল ইসলামিক প্রাকটিস এন্ড দাওয়াহ সার্কেল (IPDC) । “লিগাসি অফ ফেইথ” শিরোনামে তাদের এই সফরে সিডনি, মেলবোর্ন, অ্যাডিলেড, ব্রিসবেন এবং ক্যানবেরা শহরে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তাদের অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি, যা এই ধরনের বক্তব্যের দ্রুত বিস্তারকে আরও উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তৃতায় আজহারী দাবি করেছিলেন যে, এইডসসহ বৈশ্বিক নানা সংকটের পেছনে ইহুদিরাই দায়ী। পাশাপাশি তিনি হিটলারের কর্মকাণ্ডের প্রশংসাও করেন—যা কেবল ইতিহাস বিকৃতিই নয়, বরং গণহত্যামূলক বক্তব্যকে স্বাভাবিক করার ঝুঁকি তৈরি করে।
তার আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আদর্শিকভাবে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহ অফ নর্থ আমেরিকার আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে বক্তব্য দিয়েছেন।
সেখানে তিনি নিহাদ আওয়াদ-এর মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তবে এসব বিতর্ক সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার ভিসা বাতিল করেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়।
এই বৈপরীত্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনজীবী মুফাসসিল ইসলাম, যিনি প্রশ্ন তুলেছেন—এত বিতর্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই ধরনের ব্যক্তিরা পশ্চিমা দেশে প্রবেশের অনুমতি পান?
অন্যদিকে, এই ধরনের ইসলামিক বক্তাদের জন্য যুক্তরাজ্য তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২১ সালে ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান পার্লামেন্টে আজহারীকে “ঘৃণাবাদী প্রচারক” হিসেবে আখ্যা দেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য তার ভিসা বাতিল করে এবং দোহা থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার ফ্লাইটেও তাকে উঠতে দেওয়া হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ঘৃণাবাদী উসকানির মধ্যে একটি সীমারেখা রয়েছে, এবং সেটি অতিক্রম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্বজুড়ে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সময় এই ধরনের পদক্ষেপ শুধু অভ্যন্তরীণ নীতি নয়, বরং একটি বৈশ্বিক বার্তাও বহন করে।
তবে আন্তর্জাতিক চিত্র এখনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এক দেশে নিষিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা অন্য দেশে প্রবেশ করে একই ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে যেতে পারছেন। ডিজিটাল যুগে এই বৈষম্যের প্রভাব আরও তীব্র—কারণ একটি দেশের বক্তব্য মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
সার্বিকভাবে বিষয়টি শুধু অভিবাসন নীতি বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; এটি গণতান্ত্রিক সমাজে সহাবস্থান রক্ষার প্রশ্ন। বিদ্বেষমূলক মতাদর্শ যদি অবাধে বিস্তার লাভ করে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার একজন শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক ও ভাষ্যকার, অ্যান্ড্রু বোল্ট যার কলাম প্রকাশিত হয় হেরাল্ড সান, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং দ্য অ্যাডভার্টাইজার-এ বলেন, “সিডনির বন্ডাই এলাকায় ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর হামলার মাত্র চার মাসের মধ্যেই এন্থনি আলবানিজ সরকারের সরকারের পক্ষ থেকে এমন দুইজন মুসলিম বক্তাকে ভিসা দেওয়া হয়েছে, যারা ইহুদিবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, একজনকে ভিসা দেওয়া ভুল হতে পারে, কিন্তু দু’জন হলে তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়-বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত।
যাহোক, অস্ট্রেলিয়া একটি সীমারেখা টেনেছে। এখন প্রশ্ন—বিশ্বের অন্য দেশগুলো কি সেই পথ অনুসরণ করবে?
লেখক: গোপী আদুসুমিল্লি।
সূত্রঃ SocialNews.XYZ; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা।
আরো পড়ুন
দুই ইসলামিক বক্তাকে ভিসা দেওয়ায় লেবার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা
বাংলাদেশি ইসলামিক বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহর অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিল
আজহারীকে অস্ট্রেলিয়া থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার: আর কখনো অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন না
মৌলবাদী ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে বহিস্কার করল অস্ট্রেলিয়া
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au