কোন উদ্দেশ্যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করলেন বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক…
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- দিন দশেক আগে জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে তার সহকর্মীদেরকে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন একটু মজা করে বলেছিলেন, ভোজে পরিবেশন করা হবে ‘তিমি ও হাঙর’। তার এমন উদ্ভূত মেন্যুর কথা শুনে সংসদের অধিবেশে হাসির ঝড় উঠেছিল। কিন্তু শেষ পযর্ন্ত সেই হাসি পরিণত হয়েছে তুমুল সমালোচনা আর এক যুবকের কান্নায়। যে কান্নার শব্দ কারাগারের চার দেয়াল ভেদ করে ফিরে এসেছে ওই সংসদেই।
হাসিতে শুরু
গত ১০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের বৈঠক চলার পর যখন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সদস্যরা। সেই সময় তাদেরকে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ জানান চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনি।
সে সময় সংসদ সদস্যরা আপ্যায়নের মেন্যু জানতে চাইলে মজার ছলে চিফ হুইপ বলেন, ‘ভাই আপ্যায়নে সবই হয়। সদস্যবৃন্দ, আপনাদের জন্য সাগর থেকে তিনটি তিমি মাছ ধরে নিয়ে এসেছি এবং আরও দুটি হাঙর আসতেছে ইনশাআল্লাহ।’ তার এমন উত্তরে সংসদ সদস্যদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়।
ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন
‘তিমি ও হাঙর’ নিয়ে এমন হাসির ঘটনা নিয়ে কৌতুক করতে গিয়ে একটি রাজনৈতিক কার্টুন আঁকেন অনলাইন এক্টিভিস্ট ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিম।
এআই জেনারেটেড ওই কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম একটি বড় ট্রে-তে দুটি তিমি ও হাঙর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর ঠিক তার সামনেই পাশাপাশি বসে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুল রহমান। ভীষণ ক্ষুধার্থ- এমন বোঝাতে কার্টুনে তাদের জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে দেখানো হয়েছে।
এ এম হাসান নাসিম ব্যাঙ্গাত্মক এই কার্টুনটি শেয়ার করেন ‘দ্য ডেল্টা লেন্স’নামে একটি ফেসবুক পেজে। ওই পেজের অ্যাডমিনও তিনি। আপলোডের পর সেই কার্টুনটি ‘পাথরঘাটা’ নামের আরেকটি পেজ রিপোস্ট করে। এর বাইরে অনেকেই তাদের ব্যক্তিগত আইডি থেকেও তা শেয়ার করতে থাকে।
হাসির পরিণতি কান্না
সংসদে ‘তিমি ও হাঙর’ এর মধ্যাহ্নভোজ নিয়ে কৌতুক করতে গিয়ে করা ওই রাজনৈতিক কার্টুন কেউ কেউ সহজভাবে নিতে পারেনি। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন এক ব্যক্তি। তার নাম নজরুল ইসলাম। তিনি রাজধানীর গুলশান থানায় সাইবার সিকিউরিটি আইনের ২৫ ও ২৭ ধারায় মামলা করেন। সাংবাদিকরা পরে জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি আসলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের একজন সমর্থক এবং বিএনপি কর্মী।
নজরুল ইসলাম তার অভিযোগে বলেন, এ এম হাসান নাসিম ছাড়াও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির একটি কথাকে উধ্বৃত করে হীন ও ব্লাকমেইলের উদ্দেশ্যে ফেসবুকে অশ্লীল ও বিকৃত কার্টুন প্রকাশ ও প্রচার করেছেন। এছাড়া ওই পেজ থেকে বেশ কিছুদিন ধরেই চিপ হুইপ, বিএনপি এবং ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডের নানান সমালোচনা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিম। ছবি: সংগৃহীত
গভীর রাতে গ্রেপ্তার
এই মামলার পর গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ওয়ারেন্ট ছাড়াই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ এ এম হাসান নাসিমকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরের দিন শনিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই মো. রায়হানুর রহমানতাকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে নেন। আদালত তা নামঞ্জুর করে নাসিমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম রিমান্ড আবেদন বাতিল এবং জামিনের আবেদন করেছিলেন। কেননা মামলাটি জামিনযোগ্য ধারার। এ নিয়ে শুনানির পর তা পেন্ডিং রাখেন বিচারক। পরে জানা গেছে, জামিন বিষয়ে আগামী ২৬ এপ্রিল সিদ্ধান্ত জানাবেন তিনি।
কারাগার থেকে সংসদে
জাতীয় সংসদে হাসির রোলে যে ঘটনার শুরু হয়েছিল, তা কারাগারে থাকা এ এম হাসান নাসিমের কান্না হয়ে সেই সংসদেই ফিরে আসে। তার গ্রেপ্তারে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেন বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা। তারা দাবি করেন, এই ঘটনায় সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে। বাক-স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে। অবিলম্বে এ এম হাসান নাসিমের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিরোধী সংসদ সদস্যরা বলেন, ওই কার্টুনে জনপ্রতিনিধিদের একটি সাধারণ ও রসিকতাপূর্ণ মুহূর্তকে নিছক ব্যঙ্গাত্মক শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যা বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত, আইনি ও জনপ্রিয় মাধ্যম। এখানে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, মানহানি বা কোনো ধরনের উসকানি দেওয়ার বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সংসদের ভেতরে ঘটা একটি হালকা মেজাজের ঘটনাকে সাধারণ পাঠকের সামনে নির্ভেজাল স্যাটায়ার হিসেবে উপস্থাপন করাই ছিল মূল লক্ষ্য। অথচ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের শিকার হতে হয়েছে একজন সাধারণ নাগরিককে।
এ সময় তারা আগের সরকারের সময়কার কিছু ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বিগত সরকারের আমলে কটূক্তি করার কারণে মানুষকে গ্রেপ্তারের এমন দৃষ্টান্ত দেখা যেত।
চিফ হুইপের অজুহাত
বিরোধীদলের সদস্যদের সমালোচনার মুখে জবাব দিতে গিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে থেকেই ওই পেজ থেকে তার ওপর ‘সাইবার হামলা’ চালানো হচ্ছিল। এই দাবির পক্ষে সংসদে কিছু নথিপত্রও তুলে ধরেন তিনি।
এ এম হাসান নাসিমের গ্রেপ্তারের পক্ষে অজুহাত দিতে গিয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, কারো বিরুদ্ধে বিকৃত, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জন্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা সঠিক কাজ। কার্টুন শেয়ার করা ওই ব্যক্তি মানব সম্পদ রপ্তানী এবং মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত।
আলোচনায় তারেক রহমানের উক্তি
২০২৪ সালের ১১ আগস্ট রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন সেই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি গভীরভাবে আনন্দিত যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে’।

সংসদে বক্তব্য রাখছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। ছবি: সংগৃহীত
ওই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে আঁকা সমালোচনামূলক একটি কার্টুন বিএনপির দলীয় ফেসবুক পেজ থেকেও প্রচার করা হয়েছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দলটির ইতিবাচক অবস্থান জানান দিতেই তা করা হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই ঘটনার কথা তুলে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদে বলেন, সেই বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে কার্টুন প্রচারের জন্য গ্রেপ্তার করেছে। একজন শিল্পীর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এতে দলটির দ্বিচারিতা জনগণের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au